AN-NIKAAH.COM

বিবাহ ও দাম্পত্য ফিকহ (মাসআলা ও শরয়ী নির্দেশনা)

পাত্র-পাত্রী দেখা থেকে শুরু করে আকদ, মোহরানা, ওয়ালিমা ও দাম্পত্য জীবনের গুরুত্বপূর্ণ মাসআলাসমূহ — কুরআন, সহীহ হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের দলিলসহ।

মোট ৪৫টি মাসআলা

  • সুন্নাহ / মুস্তাহাব
  • ফরজ / আবশ্যক
  • জায়েজ / শর্তসাপেক্ষে
  • মাকরূহ / অনুচিত
  • হারাম / নাজায়েজ
  • মতভেদপূর্ণ

প্রস্তাব ও নির্বাচন

  • সামর্থ্য থাকলে বিয়ে করা নবী ﷺ-এর গুরুত্বপূর্ণ সুন্নাহ। কেউ যদি বিয়ে না করলে গুনাহে জড়িয়ে পড়ার প্রবল আশঙ্কা করেন এবং সামর্থ্য থাকে, তবে তার জন্য বিয়ে আবশ্যক হয়ে যায়।

  • দ্বীনদারি ও উত্তম চরিত্রকে অগ্রাধিকার দেওয়াই সুন্নাহ। সৌন্দর্য, পরিবার বা আর্থিক অবস্থা দেখা নিষেধ নয়, কিন্তু সেগুলো যেন দ্বীন ও আখলাকের উপরে স্থান না পায়।

  • দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে ইস্তিখারার দোয়া পড়া সুন্নাহ, সাথে অভিজ্ঞ ও বিশ্বস্ত মানুষের পরামর্শ নেওয়া। ইস্তিখারার পর স্বপ্ন দেখা জরুরি নয় — হাদিসে স্বপ্নের কোনো শর্ত নেই।

  • কোনো পাত্রের প্রস্তাবে মেয়েপক্ষ সম্মত হয়ে গেলে বা সেদিকে ঝুঁকে পড়লে, সেখানে আরেকটি প্রস্তাব দেওয়া নিষেধ। আগের প্রস্তাব নাকচ হলে, প্রস্তাবক সরে গেলে বা অনুমতি দিলে বাধা নেই।

  • না। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়ের সম্মতি ছাড়া জোর করে বিয়ে দেওয়া বৈধ নয়; নবী ﷺ এমন একটি বিয়ে বাতিল করে দিয়েছিলেন। কুমারী মেয়ের লজ্জাজনিত নীরবতাকে সম্মতি ধরা হয়, কিন্তু স্পষ্ট আপত্তি বা কান্না-প্রতিবাদ সম্মতি নয়।

  • হ্যাঁ, কাউকে পছন্দ হলে তাকে বিয়ে করা জায়েজ — বরং পরস্পরকে ভালোবাসে এমন দুজনের জন্য বিয়েকেই উত্তম সমাধান বলা হয়েছে। তবে বিয়ের আগে প্রেমের সম্পর্ক, একান্ত সাক্ষাৎ ও আবেগঘন আলাপ জায়েজ নয়।

দেখা ও কথা বলার সীমা

  • শুধু জায়েজ নয়, সুন্নাহ। নবী ﷺ বিয়ের আগে পাত্রীকে দেখে নিতে বলেছেন, কারণ এতে দুজনের মধ্যে ভালোবাসা স্থায়ী হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। পাত্রীও পাত্রকে দেখে নেবেন।

  • হানাফি মাযহাবে পাত্রীর মুখমণ্ডল ও দুই হাত দেখা যাবে — চেহারার সৌন্দর্য মুখে আর শারীরিক গঠন হাতে বোঝা যায়। দেখা হবে মাহরাম বা অভিভাবকের উপস্থিতিতে, একান্তে নয়।

  • এটি সমকালীন প্রশ্ন, আলেমদের মত ভিন্ন। সতর্ক মত হলো: সরাসরি দেখা সম্ভব হলে সেটিই উত্তম; ছবি পাঠাতে হলে শুধু যতটুকু দেখা বৈধ ততটুকু, শুধু সিদ্ধান্তের জন্য, কাউকে না ছড়িয়ে, আর সিদ্ধান্ত হলে মুছে ফেলার শর্তে।

  • প্রবাস বা দূরত্বের মতো প্রয়োজনে, দেখার উদ্দেশ্যে, অভিভাবকের উপস্থিতিতে এক-দুবার ভিডিও কলে দেখা ও প্রয়োজনীয় কথা বলার অনুমতি অনেক আলেম দিয়েছেন। দুজনের একান্ত বা নিয়মিত ভিডিও আলাপ জায়েজ নয়।

  • বিয়ের সিদ্ধান্তের জন্য প্রয়োজনীয় কথা শালীনভাবে, সীমিত পরিসরে বলা যায় — উত্তম হলো অভিভাবকের জানা ও উপস্থিতিতে। প্রেমালাপ, আবেগঘন বা রাতভর চ্যাটিং বিয়ের আগে জায়েজ নয়; তারা তখনো একে অপরের গায়রে মাহরাম।

  • না। বিয়ের আকদ না হওয়া পর্যন্ত পাত্র-পাত্রী একে অপরের গায়রে মাহরাম, তাই তাদের একান্তে থাকা বা একা ঘুরতে যাওয়া জায়েজ নয় — কথা পাকা বা বাগদান হয়ে গেলেও। দেখা করতে চাইলে মাহরাম বা পরিবারের কাউকে সাথে রাখুন।

এনগেজমেন্ট ও আংটি

  • না। বাগদান হলো বিয়ের প্রতিশ্রুতি, বিয়ে নয় — তাই এরপরও তারা একে অপরের গায়রে মাহরাম। আকদ হওয়ার আগে একান্তে থাকা, স্পর্শ বা স্বামী-স্ত্রীর মতো মেলামেশা জায়েজ নয়।

  • আকদের আগে হবু বর-কনে একে অপরের হাত ধরা বা স্পর্শ করা জায়েজ নয়, কারণ তারা তখনো গায়রে মাহরাম। আংটি বদল নিজে সুন্নাহ নয়, একটি সামাজিক রীতি — স্পর্শ ও অপচয় ছাড়া উপহার হিসেবে দেওয়া যায়।

  • না, পুরুষের জন্য সোনা পরা হারাম — আংটি, চেইন বা বোতাম যা-ই হোক। নারীদের জন্য সোনা হালাল। পুরুষ রুপার আংটি পরতে পারেন; নবী ﷺ নিজেও রুপার আংটি ব্যবহার করেছেন।

রুকন, ওলি ও সাক্ষী

  • বিয়ের মূল রুকন হলো ইজাব (প্রস্তাব) ও কবুল (গ্রহণ)। শুদ্ধ হওয়ার শর্ত: বর-কনের মধ্যে বিয়ের কোনো বাধা না থাকা, দুজনের সম্মতি, একই বৈঠকে দুজন সাক্ষীর সামনে ইজাব-কবুল। মোহর আদায় করা ওয়াজিব, তবে নির্ধারণ না হলেও বিয়ে শুদ্ধ হয়।

  • হানাফি মাযহাবে দুজন প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান মুসলিম পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী সাক্ষী লাগে, যারা একই বৈঠকে ইজাব-কবুল নিজ কানে শুনবেন। সাক্ষী ন্যায়পরায়ণ হওয়া উত্তম, তবে হানাফি মতে বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়।

  • এ বিষয়ে মাযহাবগুলোর মতভেদ আছে। অধিকাংশ আলেমের মতে ওলি ছাড়া মেয়ের বিয়ে শুদ্ধ হয় না। হানাফি মাযহাবে প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান মেয়ে নিজে বিয়ে করলে তা শুদ্ধ — তবে পাত্র সমকক্ষ (কুফু) না হলে ওলি আপত্তি করতে পারেন, আর ওলিকে যুক্ত রাখাই সুন্নাহসম্মত পথ।

  • আকদের আগে খুতবাতুল হাজাহ পড়া, বিয়ের কথা প্রকাশ করা, মোহরের নগদ অংশ আদায় করা এবং নবদম্পতির জন্য ‘বারাকাল্লাহু লাকা…’ দোয়া করা সুন্নাহ। আকদ সহজ ও অনাড়ম্বর রাখাই উত্তম।

  • না, একবার স্পষ্টভাবে ‘কবুল করলাম’ বললেই বিয়ে সম্পন্ন হয়। তিনবার বলা একটি প্রচলিত রীতি — বললে দোষ নেই, কিন্তু শর্ত বা সুন্নাহ মনে করা ঠিক নয়।

  • সরাসরি ফোন বা ভিডিও কলে ইজাব-কবুল করলে সাক্ষীর শর্ত পূরণ নিয়ে সমস্যা থাকে, তাই অনেক আলেম ও ইসলামিক ফিকহ একাডেমি একে সঠিক পদ্ধতি মনে করেন না। নিরাপদ পথ: দূরে থাকা পক্ষ ফোনে কাউকে উকিল নিযুক্ত করবেন, আর উকিল সাক্ষীদের সামনে মজলিসে কবুল করবেন।

  • ইজাব-কবুল ও সাক্ষী থাকলে শরিয়তের দৃষ্টিতে বিয়ে শুদ্ধ হয়, নিবন্ধন না হলেও। কিন্তু বাংলাদেশের আইনে প্রতিটি মুসলিম বিয়ে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক, না করলে শাস্তিযোগ্য অপরাধ — আর স্ত্রীর মোহর ও অধিকার রক্ষায় নিবন্ধনই সবচেয়ে বড় সুরক্ষা।

  • বাংলাদেশে প্রচলিত ‘কোর্ট ম্যারেজ’ সাধারণত নোটারির সামনে একটি হলফনামা (এফিডেভিট) — এটি নিজে বিয়ে নয়, আইনে ‘কোর্ট ম্যারেজ’ নামে কোনো বিয়ের বিধান নেই। মুসলমানের বিয়ে হয় সাক্ষীর সামনে ইজাব-কবুলের মাধ্যমে নিকাহ, যা কাজীর কাছে নিবন্ধন করতে হয়।

  • হানাফি মাযহাবে দুজন সাক্ষীর সামনে ইজাব-কবুল হলে বিয়ে শুদ্ধ, গোপন রাখা হলেও। কিন্তু বিয়ের কথা প্রকাশ করা সুন্নাহ, আর গোপন বিয়ে স্ত্রীর অধিকার ও সম্মানের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ — তাই এটি অনুচিত।

মোহরানা ও যৌতুক

  • মোহর একান্তই স্ত্রীর হক, স্বামীর উপর ফরজ ঋণ — বাবা-মা বা অন্য কারো নয়। স্ত্রী নিজে খুশিমনে মাফ করলে তা মাফ হয়, কিন্তু চাপ দিয়ে, লজ্জায় ফেলে বা বাসর রাতে আবদার করে মাফ করিয়ে নেওয়া উচিত নয়।

  • সুন্নাহ হলো বরের সামর্থ্যের মধ্যে সহজ মোহর — ‘সবচেয়ে উত্তম বিয়ে সেটি, যা সবচেয়ে সহজ।’ লোক দেখানোর জন্য এমন বড় অঙ্ক লেখা, যা পরিশোধের সামর্থ্য বা নিয়ত নেই, অনুচিত। হানাফি মাযহাবে সর্বনিম্ন মোহর দশ দিরহাম (রুপা)।

  • মোহরের নগদ অংশ আকদের সময় বা স্ত্রী চাইলেই দিতে হয়; বাকি অংশ নির্ধারিত সময়ে, আর সময় না লেখা থাকলে তালাক বা মৃত্যুতে পরিশোধযোগ্য হয়। অপরিশোধিত মোহর স্বামীর ঋণ। দুজনের সম্মতিতে গয়না বা সম্পদ দিয়েও মোহর আদায় করা যায়।

  • না। বরপক্ষ কনেপক্ষের কাছে টাকা, আসবাব, মোটরসাইকেল বা অন্য কিছু দাবি করা — সরাসরি হোক বা ইশারায় — অন্যায়ভাবে অন্যের সম্পদ গ্রহণ, যা কুরআনে নিষিদ্ধ। বাংলাদেশের আইনেও যৌতুক দাবি করা, দেওয়া ও নেওয়া দণ্ডনীয় অপরাধ। কনেপক্ষের স্বেচ্ছায়, কোনো চাপ ছাড়া দেওয়া উপহার যৌতুক নয়।

গায়ে হলুদ ও প্রচলিত রীতি

  • হলুদ বা প্রসাধন দিয়ে কনেকে সাজানো নিজে হারাম নয় — নারীরা নিজেদের মধ্যে ঘরোয়াভাবে করলে দোষ নেই। সমস্যা হলো এর সাথে যুক্ত রীতিগুলো: পরপুরুষের কনেকে হলুদ লাগানো বা ছোঁয়া, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, উচ্চশব্দে বাদ্য, অপচয় ও ধর্মীয় আচার হিসেবে পালন।

  • গেট আটকে বা জুতা লুকিয়ে দরকষাকষি করে বরপক্ষের কাছ থেকে টাকা আদায় করা — যা না দিলে বরকে অপমান বা আটকে রাখা হয় — অন্যের সম্পদ অন্যায়ভাবে নেওয়ার মধ্যে পড়ে। বর খুশিমনে নিজে থেকে কাউকে উপহার দিলে তাতে দোষ নেই।

    বিস্তারিত

    রীতিটি অনেক পরিবারে মজা-আনন্দ হিসেবে চলে আসছে, আর এর পেছনে কারো খারাপ উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু বাস্তবে প্রায়ই তা চাপ, তর্ক এমনকি ঝগড়ায় গড়ায়; বর বা তাঁর পরিবার লজ্জায় পড়ে টাকা দেন। সম্মতি ছাড়া নেওয়া এমন টাকা হালাল নয় (৪:২৯)।

    এর সাথে প্রায়ই যুক্ত থাকে কনেপক্ষের তরুণী ও বরপক্ষের তরুণদের ঠাট্টা-মশকরা ও মেলামেশা, যা পর্দার বিধানের পরিপন্থী।

    আনন্দ ধরে রাখার সহজ উপায়: বরপক্ষ আগে থেকেই ছোটদের জন্য উপহার বা মিষ্টির ব্যবস্থা রাখুক, খুশিমনে দিক; আর কনেপক্ষ দাবি-দরকষাকষি বাদ দিয়ে সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা জানাক।

    দলিল

    • কুরআনসূরা আন-নিসা ৪:২৯

      يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُمْ بَيْنَكُمْ بِالْبَاطِلِ إِلَّا أَنْ تَكُونَ تِجَارَةً عَنْ تَرَاضٍ مِنْكُمْ

      হে মুমিনগণ, তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস কোরো না — তবে পারস্পরিক সম্মতিতে ব্যবসা হলে ভিন্ন কথা।

    • কুরআনসূরা আন-নূর ২৪:৩০–৩১

      قُلْ لِلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ … وَقُلْ لِلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ

      মুমিন পুরুষদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে… আর মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন দৃষ্টি সংযত রাখে…

    WhatsAppফেসবুক
  • বিয়েতে দফ (একদিকে চামড়া লাগানো, ঝুনঝুনি ছাড়া হাতে বাজানোর ঢোল) বাজিয়ে বিয়ের কথা প্রকাশ করা হাদিস দ্বারা প্রমাণিত এবং মুস্তাহাব। শালীন কথার গান — মেয়েরা নিজেদের মধ্যে — জায়েজ। অন্য বাদ্যযন্ত্রের বিধান আলাদা মাসআলায় দেখুন।

  • চার মাযহাবসহ অধিকাংশ আলেমের মতে দফ ছাড়া অন্য বাদ্যযন্ত্র (মিউজিক) হারাম, বিয়েতেও। কিছু আলেমের ভিন্নমত আছে। তবে ডিজে পার্টির সাথে সাধারণত যে মেলামেশা, অশ্লীল গান, উচ্চশব্দে প্রতিবেশীর কষ্ট ও অপচয় যুক্ত থাকে, তা সব মতেই বর্জনীয়।

  • ক্যামেরায় ছবি তোলার বিধান নিয়ে আলেমদের মতভেদ আছে: বাংলাদেশের অনেক হানাফি আলেম জীবিত প্রাণীর ছবি নিষেধ বলেন, আবার অনেক আলেম ক্যামেরার ছবিকে নিষিদ্ধ প্রতিকৃতির মধ্যে ধরেন না। তবে পর্দাহীন নারীদের ছবি-ভিডিও তুলে ছড়ানো এবং অপচয় — সব মতেই বর্জনীয়।

  • পর্দার বিধান বিয়ের দিনেও প্রযোজ্য। নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং সাজসজ্জা করা কনেকে মঞ্চে বসিয়ে সব অতিথি — পরপুরুষসহ — দেখানো জায়েজ নয়। নারী ও পুরুষের আলাদা বসার ব্যবস্থা করাই সুন্নাহসম্মত।

  • সামর্থ্যের মধ্যে আনন্দ-আয়োজন বৈধ, কিন্তু অপচয় (ইসরাফ) ও অপব্যয় (তাবযির) কুরআনে স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ — অপব্যয়কারীদের শয়তানের ভাই বলা হয়েছে। ঋণ করে, লোক দেখাতে বা প্রতিযোগিতা করে আয়োজন বিয়েকে কঠিন করে তোলে।

  • না, ইসলামে কোনো মাস, দিন বা তারিখ বিয়ের জন্য অশুভ নয় — যেকোনো সময় বিয়ে করা জায়েজ। নবী ﷺ বলেছেন, কুলক্ষণ বা অশুভ লক্ষণ বলে কিছু নেই; আর জাহেলি যুগে অশুভ মনে করা শাওয়াল মাসেই তিনি আয়েশা (রা.)-কে বিয়ে করেছেন।

বাসর রাতের সুন্নাহ ও আদব

  • স্ত্রীর কপালের সামনের অংশে হাত রেখে বিসমিল্লাহ বলে বরকতের দোয়া পড়া সুন্নাহ — ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরা মা জাবালতাহা আলাইহি…’। তারপর নরম ও সুন্দর আচরণে নতুন জীবনের শুরু করা।

  • বাসর রাতে স্বামী-স্ত্রী একসাথে দুই রাকাত নফল নামাজ পড়া মুস্তাহাব। তবে এটি নবী ﷺ-এর কোনো হাদিস নয় — ইবনে মাসউদ, আবু যর ও হুযাইফা (রা.)-সহ কয়েকজন সাহাবির আমল ও উপদেশ থেকে এসেছে।

  • সুন্নাহ হলো বলা: ‘বিসমিল্লাহ, আল্লাহুম্মা জান্নিবনাশ শাইতানা ওয়া জান্নিবিশ শাইতানা মা রাযাকতানা।’ নবী ﷺ বলেছেন, এ দোয়া পড়ার পর সন্তান হলে শয়তান তার ক্ষতি করতে পারবে না।

  • না। স্বামী-স্ত্রীর একান্ত বিষয় বন্ধু, আত্মীয় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করা গুরুতর অন্যায় — নবী ﷺ এমন ব্যক্তিকে কিয়ামতের দিন মর্যাদায় সবচেয়ে নিকৃষ্টদের একজন বলেছেন। চিকিৎসা বা সমস্যার সমাধানে বিশেষজ্ঞ বা আলেমকে প্রয়োজনমতো বলা ব্যতিক্রম।

ওয়ালিমা ও পারস্পরিক হক

  • ওয়ালিমা — বিয়ে উপলক্ষে বরের পক্ষ থেকে খাওয়ানো — সুন্নাহ; নবী ﷺ বলেছেন, ‘একটি ছাগল দিয়ে হলেও ওয়ালিমা করো।’ আয়োজন বরের দায়িত্ব, সামর্থ্য অনুযায়ী। শক্তিশালী মত হলো বাসরের পরে করা; তবে আকদের সময় বা পরের দিনগুলোতে করলেও আদায় হয়।

  • ওয়ালিমায় শুধু ধনী ও প্রভাবশালীদের না ডেকে গরিব আত্মীয়-প্রতিবেশীদেরও দাওয়াত দিন — শুধু ধনীদের ডাকা ওয়ালিমার খাবারকে নিকৃষ্ট বলা হয়েছে। আর ওয়ালিমার দাওয়াত পেলে কোনো ওজর না থাকলে যাওয়া জরুরি, যদি সেখানে স্পষ্ট গুনাহের আয়োজন না থাকে।

  • মোহর আদায়, সামর্থ্য অনুযায়ী খাবার, পোশাক ও বাসস্থানের ব্যবস্থা (নাফাকা), আর সদ্ভাবে জীবনযাপন — এগুলো স্বামীর উপর স্ত্রীর হক। স্ত্রী নিজের উপার্জন বা সম্পদ থাকলেও ভরণপোষণের দায় স্বামীর।

  • ভালো কাজে স্বামীর কথা মানা, তাঁর অনুপস্থিতিতে নিজের সম্মান ও ঘরের আমানত রক্ষা, তাঁর অনুমতি ছাড়া কাউকে ঘরে না আনা এবং দাম্পত্যের হক আদায় — এগুলো স্বামীর প্রতি স্ত্রীর দায়িত্ব। কুরআন বলেছে, দুজনেরই একে অপরের উপর ন্যায়সংগত অধিকার আছে।

  • হানাফি ফিকহ অনুযায়ী শ্বশুর-শাশুড়ির সেবা করা স্ত্রীর আইনগত দায়িত্ব নয় — বাবা-মায়ের সেবার দায়িত্ব ছেলের। তবে স্বামীর বাবা-মাকে সম্মান ও সাধ্যমতো সেবা করা উত্তম আখলাক ও সওয়াবের কাজ। স্ত্রীর নিজের থাকার জন্য আলাদা ঘর পাওয়ার অধিকার আছে, পুরো আলাদা বাড়ি জরুরি নয়।

প্রচলিত রীতি বনাম সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

অনেক রীতি ভালো নিয়তেই চলে আসছে। পাশাপাশি রেখে দেখুন — সুন্নাহর পথ প্রায়ই সহজ, কম খরচের ও সবার জন্য সম্মানজনক।

  • প্রচলিত রীতি

    বিয়ের আগে দীর্ঘদিন ফোনে-চ্যাটে সম্পর্ক, একা দেখা-সাক্ষাৎ

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    পরিবারের মাধ্যমে প্রস্তাব; অভিভাবকের উপস্থিতিতে দেখা ও প্রয়োজনীয় কথা; কথা পাকা হলে দ্রুত আকদ

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    বাগদানে হবু বর নিজে কনের হাতে আংটি পরান

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    বরের মা বা বোন কনেকে আংটি পরান, অথবা উপহার হিসেবে বাক্সে দেওয়া হয়

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    ‘সবাই দেয়’ বলে কনেপক্ষের কাছে আসবাব, টাকা বা গাড়ির প্রত্যাশা

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    সংসারের খরচ ও মোহর বরের দায়িত্ব; কনের পরিবার যা দেন তা স্বেচ্ছায়, মেয়ের নিজের সম্পদ

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    সম্মান দেখাতে বড় অঙ্কের মোহর লেখা, পরিশোধের পরিকল্পনা ছাড়া

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    সামর্থ্যের মধ্যে সহজ মোহর, নগদ অংশ আকদেই আদায়, বাকিটা লিখিত পরিকল্পনায়

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    বাসর রাতে স্ত্রীর কাছ থেকে মোহর মাফ চেয়ে নেওয়া

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    মোহর পরিশোধ করা; স্ত্রী কিছু ছাড়লে তা হবে তাঁর নিজের খুশিতে

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    গায়ে হলুদে আত্মীয় পুরুষরাও কনেকে হলুদ লাগান, মঞ্চে সবার সামনে সাজ

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    মেয়েরা নিজেদের মধ্যে কনেকে সাজায়; পুরুষদের আয়োজন আলাদা

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    গেট আটকে বা জুতা লুকিয়ে দরকষাকষি করে টাকা আদায়

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    সম্মানের সাথে অভ্যর্থনা; বরপক্ষ খুশিমনে ছোটদের উপহার দেয়

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    ব্যান্ড-ডিজে, রাতভর উচ্চশব্দে গান-বাজনা

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    দফ বাজিয়ে বিয়ের কথা প্রকাশ, শালীন গান — নারীরা নিজেদের মধ্যে

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    এক হলে নারী-পুরুষ একসাথে, কনেকে মঞ্চে বসিয়ে সবাইকে দেখানো

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    নারী ও পুরুষের আলাদা বসার ব্যবস্থা; কনের মঞ্চ নারীদের অংশে

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    ‘কোর্ট ম্যারেজ’-এর হলফনামাকেই বিয়ে মনে করা

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    সাক্ষীর সামনে ইজাব-কবুলে নিকাহ এবং কাজীর কাছে নিবন্ধন

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    কনেপক্ষের বড় ভোজের প্রত্যাশা, ঋণ করে লোক দেখানো আয়োজন

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    বরের পক্ষ থেকে সামর্থ্য অনুযায়ী ওয়ালিমা, গরিবদেরও দাওয়াত

    মাসআলা ও দলিল দেখুন
  • প্রচলিত রীতি

    মহররম বা ‘অশুভ’ মাস-দিন এড়িয়ে তারিখ বাছাই

    সুন্নাহসম্মত পদ্ধতি

    যেকোনো মাসে বিয়ে; শুধু পরিবারের সুবিধা দেখে দিন ঠিক করা

    মাসআলা ও দলিল দেখুন

আপনার প্রশ্ন পাঠান

এখানে উত্তর পাননি? আমাদের সাপোর্ট সেন্টারে প্রশ্নটি লিখে পাঠান। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর নির্ভরযোগ্য দলিলসহ এই পাতায় যুক্ত করা হতে পারে — আপনার নাম বা পরিচয় ছাড়া। ব্যক্তিগত বা জটিল বিষয়ে সরাসরি স্থানীয় আলেম/মুফতির পরামর্শ নিন।

আসসালামু আলাইকুম। বিবাহ ও দাম্পত্য ফিকহ পাতার জন্য আমার একটি প্রশ্ন: … (প্রশ্নটি আমার নাম ছাড়া পাতায় যুক্ত করা যাবে।)

প্রশ্ন পাঠাতে অ্যাকাউন্টে লগইন করতে হবে — লগইনের পর আপনাকে সরাসরি সাপোর্ট সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হবে।

এই সংকলন সম্পর্কে

এই মাসআলাগুলো কোন মাযহাব অনুযায়ী?

মূলত হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, কারণ বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান এ মাযহাব অনুসরণ করেন। যেখানে শাফেয়ি, মালেকি বা হাম্বলি মাযহাবের মত উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন — যেমন ওলি, সাক্ষী বা মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ — সেখানে “মতভেদ আছে” অংশে তা জানানো হয়েছে।

“মতভেদপূর্ণ” চিহ্ন দেওয়া মাসআলায় কী করব?

যেখানে নির্ভরযোগ্য আলেমদের মধ্যে দলিলভিত্তিক মতভেদ আছে, সেখানে একটি মতকে একমাত্র সঠিক বলে দেখানো হয়নি। আপনি যে আলেমের উপর আস্থা রাখেন, তাঁর মত অনুসরণ করুন, আর ভিন্নমতের মানুষকে দোষারোপ করবেন না।

হাদিসের নম্বর আমার বাংলা বইয়ের সাথে মিলছে না কেন?

এখানে আন্তর্জাতিক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে — সহীহ বুখারী ফাতহুল বারী অনুযায়ী, সহীহ মুসলিম মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকী অনুযায়ী। ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা অন্য প্রকাশনীর বাংলা অনুবাদে নম্বর ভিন্ন হতে পারে; অধ্যায়ের নাম দিয়ে খুঁজলে সহজে পাবেন।

দুর্বল হাদিস কেন উল্লেখ করা হয়েছে?

কোনো দুর্বল হাদিসের উপর বিধান দাঁড় করানো হয়নি। কয়েকটি জায়গায় প্রচলিত বর্ণনাটি দুর্বল — তা স্পষ্টভাবে জানাতে এবং বিধানটি অন্য কোন সহীহ দলিলে প্রমাণিত তা দেখাতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সুন্নাহসম্মত বিয়ের জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজছেন?

পরিবারের মাধ্যমে, নিরাপদে ও সম্মানের সাথে পাত্র-পাত্রী খুঁজুন।

জরুরি কথা

মাসআলাগুলো হানাফি মাযহাব (বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান যে মাযহাব অনুসরণ করেন) অনুযায়ী সাজানো; যেখানে অন্য মাযহাব বা আলেমদের মত উল্লেখযোগ্যভাবে ভিন্ন, সেখানে “মতভেদ আছে” লিখে জানানো হয়েছে।

হাদিসের নম্বর আন্তর্জাতিক নম্বর অনুযায়ী (সহীহ বুখারী — ফাতহুল বারী, সহীহ মুসলিম — মুহাম্মাদ ফুয়াদ আবদুল বাকী); ইসলামিক ফাউন্ডেশন বা অন্য বাংলা সংস্করণে নম্বর ভিন্ন হতে পারে। আইনের তথ্য বাংলাদেশ সরকারের আইন ওয়েবসাইট (bdlaws.minlaw.gov.bd) থেকে মিলিয়ে নেওয়া।

এটি শিক্ষামূলক সংকলন; নিজের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য নির্ভরযোগ্য আলেম/মুফতির পরামর্শ নিন।

আরও ফ্রি টুলস ও গাইড

বিয়ের প্রস্তুতিতে কাজে লাগবে — সম্পূর্ণ বিনামূল্যে