AN-NIKAAH.COM

কাবিননামা ও ইসলামিক শর্তাবলী গাইড

বাংলাদেশের সরকারি কাবিননামা ফর্মের প্রতিটি কলামের সহজ ব্যাখ্যা, শরয়ী নির্দেশনা এবং কাজী অফিসে যাওয়ার আগে দুই পরিবারের সম্মতিতে বৈধ শর্তাবলীর খসড়া তৈরি করার টুল।

প্রতিটি কলামে চাপ দিলে দেখবেন — কী জানতে চাওয়া হয়, কী লিখবেন, কোন ভুল এড়াবেন, আর শরিয়ত ও আইনের কথা।

সাধারণ তথ্য — কলাম ১ থেকে ১২

কোথায় বিয়ে হলো, বর-কনে কে, তাঁদের উকিল ও সাক্ষী কারা, আর বিয়ের তারিখ। এই অংশের ভুল পরে সংশোধন করাতে ঝামেলা হয়, তাই জাতীয় পরিচয়পত্রের সাথে বানান মিলিয়ে নিন।

১বিয়ের স্থান
কী জানতে চাওয়া হয়

যে ওয়ার্ড, শহর বা ইউনিয়ন, থানা ও জেলায় বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

কী লিখবেন

বিয়ের মজলিস যেখানে হয়েছে সেই এলাকার নাম — বর বা কনের স্থায়ী ঠিকানা নয়।

২বরের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা
কী জানতে চাওয়া হয়

বর ও তাঁর পিতার নাম, তাঁদের বাসস্থানের ঠিকানাসহ।

কী লিখবেন

জাতীয় পরিচয়পত্রে যে বানান আছে ঠিক সেই বানানে নাম; গ্রাম/মহল্লা, ডাকঘর, থানা ও জেলাসহ পূর্ণ ঠিকানা। কাজী সাহেব মায়ের নামও লিখতে পারেন।

সাধারণ ভুল

ডাকনাম লেখা, বা পরিচয়পত্রের সাথে বানানের অমিল — পাসপোর্ট, ভিসা বা উত্তরাধিকারের কাজে পরে সমস্যা হয়।

৩বরের বয়স ও জন্মতারিখ
কী জানতে চাওয়া হয়

২০২৫ সালের সংশোধন অনুযায়ী জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী বয়স ও জন্মতারিখ; পরিচয়পত্র না থাকলে জন্ম নিবন্ধন সনদ, জেএসসি/এসএসসি বা সমমানের সনদ, অথবা বাবা-মা বা আইনগত অভিভাবকের বয়সসংক্রান্ত হলফনামা অনুযায়ী।

কী লিখবেন

পরিচয়পত্র বা সনদে যে জন্মতারিখ আছে, হুবহু সেটি।

শরিয়ত ও আইন

বাংলাদেশে বিয়ের আইনগত বয়স ছেলেদের ২১ ও মেয়েদের ১৮ বছর; কাজী সাহেব বয়স নিশ্চিত না হয়ে বিয়ে নিবন্ধন করতে পারেন না।

৪কনের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা
কী জানতে চাওয়া হয়

কনে ও তাঁর পিতার নাম, তাঁদের বাসস্থানের ঠিকানাসহ।

কী লিখবেন

বরের মতোই — পরিচয়পত্রের বানানে নাম ও পূর্ণ ঠিকানা।

৫কনে অবিবাহিতা, বিধবা না তালাকপ্রাপ্তা
কী জানতে চাওয়া হয়

ফর্মের ভাষায়: কন্যা অবিবাহিতা, বিধবা অথবা তালাকপ্রাপ্তা নারী কিনা? (২০২৫ সালের সংশোধনে “কুমারী” শব্দের জায়গায় “অবিবাহিতা” এসেছে।)

কী লিখবেন

তিনটির যেটি সত্য, সেটি।

সাধারণ ভুল

আগের বিয়ের তথ্য লুকানো — এটি পরে বড় আইনি ও পারিবারিক জটিলতা তৈরি করে।

৬কনের বয়স ও জন্মতারিখ
কী জানতে চাওয়া হয়

বরের মতোই, জাতীয় পরিচয়পত্র (না থাকলে জন্ম নিবন্ধন বা শিক্ষা সনদ, অথবা হলফনামা) অনুযায়ী বয়স ও জন্মতারিখ।

কী লিখবেন

সনদে যে জন্মতারিখ আছে, হুবহু সেটি।

৬কবর ও কনের ছবি
কী জানতে চাওয়া হয়

২০২৫ সালের সংশোধনে যুক্ত নতুন ঘর: বর ও কনের পাসপোর্ট সাইজের ছবি।

কী লিখবেন

সাম্প্রতিক পাসপোর্ট সাইজের ছবি সাথে নিয়ে যান।

৭কনের উকিল
কী জানতে চাওয়া হয়

কনে উকিল নিযুক্ত করে থাকলে সেই উকিলের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা।

কী লিখবেন

সাধারণত কনের বাবা, ভাই বা কোনো নিকটাত্মীয়। উকিল কনের কাছ থেকে বিয়ের সম্মতি নিয়ে মজলিসে তা পৌঁছে দেন।

শরিয়ত ও আইন

কনের স্বাধীন সম্মতি বিয়ের জন্য অপরিহার্য — রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পূর্বে বিবাহিতা নারীর বিয়ে তাঁর মত ছাড়া এবং কুমারীর বিয়ে তাঁর অনুমতি ছাড়া দেওয়া যাবে না (সহীহ বুখারী ৫১৩৬)। উকিল ও অভিভাবকের (ওলি) পার্থক্য নিচে দেখুন।

৮কনের উকিল নিয়োগের সাক্ষী
কী জানতে চাওয়া হয়

যাঁদের সামনে কনে উকিল নিয়োগ করেছেন, তাঁদের নাম, পিতার নাম, ঠিকানা ও কনের সাথে সম্পর্ক।

কী লিখবেন

দুজন সাক্ষী, যাঁরা নিজে উপস্থিত থেকে কনের সম্মতি শুনেছেন — সম্পর্কসহ (যেমন চাচা, মামা)।

সাধারণ ভুল

কনের সম্মতি না শুনেই কারও নাম সাক্ষী হিসেবে বসিয়ে দেওয়া।

৯বরের উকিল
কী জানতে চাওয়া হয়

বর উকিল নিযুক্ত করে থাকলে তাঁর নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা।

কী লিখবেন

বর নিজে মজলিসে উপস্থিত থেকে কবুল বললে সাধারণত এখানে কিছু লেখা হয় না।

১০বরের উকিল নিয়োগের সাক্ষী
কী জানতে চাওয়া হয়

বরের উকিল নিয়োগের সাক্ষীদের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা।

কী লিখবেন

বর নিজে উপস্থিত থাকলে সাধারণত ফাঁকা থাকে।

১১বিয়ের সাক্ষী
কী জানতে চাওয়া হয়

বিয়ের সাক্ষীদের নাম, পিতার নাম ও ঠিকানা। ২০২৫ সালের সংশোধনের পর ফর্মে তিনজন সাক্ষীর ঘর আছে।

কী লিখবেন

যাঁরা মজলিসে উপস্থিত থেকে প্রস্তাব ও কবুল নিজ কানে শুনেছেন, তাঁদের নাম।

শরিয়ত ও আইন

হানাফি মাযহাবে বিয়ে শুদ্ধ হতে অন্তত দুজন সাক্ষী লাগে — দুজন মুসলিম পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী; প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের, যাঁরা প্রস্তাব ও কবুল একসাথে শুনেছেন। বিস্তারিত নিচে।

১২বিয়ের তারিখ
কী জানতে চাওয়া হয়

যে তারিখে বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে।

কী লিখবেন

আকদ (প্রস্তাব ও কবুল) যেদিন হয়েছে সেই তারিখ — ওয়ালিমা বা অনুষ্ঠানের তারিখ নয়।

দেনমোহর — কলাম ১৩ থেকে ১৬

মোহর স্ত্রীর অধিকার, স্বামীর ওপর ঋণ — “তোমরা নারীদের তাদের মোহর দিয়ে দাও সন্তুষ্টচিত্তে” (সূরা আন-নিসা ৪:৪)। কাবিননামার সবচেয়ে বেশি বিবাদ হয় এই চারটি ঘর নিয়েই।

১৩দেনমোহরের পরিমাণসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কী জানতে চাওয়া হয়

মোট দেনমোহর কত টাকা — অঙ্কে ও কথায়।

কী লিখবেন

দুই পরিবার যে অঙ্কে একমত হয়েছেন এবং বর যা সত্যিই পরিশোধ করার সামর্থ্য ও নিয়ত রাখেন। অঙ্কে ও কথায় যেন একই সংখ্যা থাকে।

সাধারণ ভুল

“সামাজিক মর্যাদা” রক্ষার জন্য সাধ্যের বাইরে বিশাল অঙ্ক লেখা, যা দেওয়ার ইচ্ছা কারও নেই — মোহর দেখানোর বিষয় নয়, পরিশোধের দায়।

আবার উল্টোটা: কাবিন ফি কমাতে আসল অঙ্কের চেয়ে কম লেখা। পরে কোনো বিবাদে প্রমাণ হিসেবে কাবিননামায় লেখা অঙ্কটিই সামনে আসে।

শরিয়ত ও আইন

সূরা আন-নিসা ৪:২৪ মোহরকে “ফরিদা” (নির্ধারিত আবশ্যিক দায়) বলেছে, আর নির্ধারণের পর দুজনের সম্মতিতে কমবেশি করার সুযোগও রেখেছে। হানাফি মতে মোহরের সর্বনিম্ন পরিমাণ ১০ দিরহাম রুপার মূল্য।

কাবিনের সরকারি ফি এই অঙ্কের ওপর নির্ভর করে — “কাবিন ফি” ট্যাবে হিসাব দেখুন।

মোহরানা ক্যালকুলেটরে মোহরে ফাতেমী ও সর্বনিম্ন মোহর দেখুন

১৪নগদ (তলবি) ও বাকি (বিলম্বিত) মোহরসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কী জানতে চাওয়া হয়

মোট মোহরের কত অংশ মুয়াজ্জল (তলবি) আর কত অংশ মু'অজ্জল (বিলম্বিত) — দুটি আলাদা ঘরে, অঙ্কে ও কথায় (২০২৫ সালের সংশোধিত ফর্ম)।

কী লিখবেন

তলবি বা নগদ (মুআজ্জাল) অংশ স্ত্রী চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য; বিলম্বিত বা বাকি (মুয়াজ্জাল) অংশ পরে পরিশোধের শর্তে থাকে। দুই ঘরের যোগফল যেন ১৩ নং কলামের মোট অঙ্কের সমান হয়।

বাকি অংশ কবে বা কীভাবে পরিশোধ হবে — নির্দিষ্ট সময়, কিস্তি, নাকি চাওয়ামাত্র — তা ১৭ নং কলামে লিখে রাখা ভালো।

সাধারণ ভুল

বানানের মিলে বিভ্রান্তি: ফর্মে “মুয়াজ্জল” মানে তলবি (নগদ) আর “মু'অজ্জল” মানে বিলম্বিত (বাকি)। ঘরের পাশে লেখা “তলবি” ও “বিলম্বিত” শব্দ দুটি দেখে অঙ্ক বসান।

পুরো মোহর “বাকি” লিখে ধরে নেওয়া যে কখনো দিতে হবে না — বাকি মোহরও স্ত্রীর পাওনা, আর তালাক বা স্বামীর মৃত্যুতে তা সাথে সাথে প্রদেয় হয়ে যায়।

শরিয়ত ও আইন

আইন: নিকাহনামায় মোহর পরিশোধের ধরন লেখা না থাকলে পুরো মোহর চাওয়ামাত্র পরিশোধযোগ্য ধরা হয় (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১, ধারা ১০)।

মোহরানা ক্যালকুলেটরে মোহরে ফাতেমী ও সর্বনিম্ন মোহর দেখুন

১৫বিয়ের সময় পরিশোধিত অংশসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কী জানতে চাওয়া হয়

বিয়ের সময় মোহরের কোনো অংশ পরিশোধ করা হয়েছে কি না; হলে কত টাকা (অঙ্কে ও কথায়)।

কী লিখবেন

মজলিসে সত্যিই যা হাতে দেওয়া হয়েছে, শুধু সেটুকু। কিছু দেওয়া না হলে “না”।

সাধারণ ভুল

দেওয়া হয়নি এমন টাকা “পরিশোধিত” দেখানো, অথবা উপহার হিসেবে দেওয়া গহনা দাম না মিলিয়েই মোহর হিসেবে গোনা।

১৬মোহরের বদলে দেওয়া সম্পত্তিসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কী জানতে চাওয়া হয়

মোহরের পুরো বা আংশিক অংশের পরিবর্তে কোনো সম্পত্তি (যেমন গহনা বা জমি) দেওয়া হয়েছে কি না — বিবরণ ও দুই পক্ষের সম্মত মূল্যসহ।

কী লিখবেন

গহনা দিলে তার ওজন (ভরি/গ্রাম) ও দুই পক্ষ যে মূল্যে একমত হয়েছেন; জমি হলে দাগ-খতিয়ানসহ বিবরণ। কিছু না দিলে “না”।

সাধারণ ভুল

“গহনা দেওয়া হয়েছে” লিখে ওজন বা মূল্য না লেখা — পরে কোন গহনা মোহরের অংশ ছিল, তা নিয়ে বিবাদ হয়।

বিশেষ শর্ত — কলাম ১৭

১৭বিশেষ শর্তাদিসবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কী জানতে চাওয়া হয়

বিয়ের সময় দুই পক্ষ কোনো বিশেষ শর্তে একমত হয়ে থাকলে তা।

কী লিখবেন

দুই পরিবার আগে থেকে যে বৈধ শর্তগুলোতে একমত হয়েছেন — যেমন ভরণপোষণ ও হাতখরচ, পড়াশোনা বা চাকরি, বাসস্থান, বাকি মোহর পরিশোধের সময়সূচি, বিরোধে সালিশ। পরিষ্কার, সংক্ষিপ্ত ও নির্দিষ্ট ভাষায় লিখুন।

কোনো শর্ত না থাকলে “নাই” লিখুন — ঘর ফাঁকা রাখবেন না।

সাধারণ ভুল

মজলিসে বসে তাড়াহুড়ো করে শর্ত ঠিক করা — আগে থেকে দুই পরিবার বসে খসড়া করে নিন।

অস্পষ্ট শর্ত, যেমন “স্বামী স্ত্রীকে সুখে রাখবে” — এর কোনো মাপ নেই।

শরিয়তবিরোধী শর্ত লেখা — যেমন স্বামী তাঁর বাবা-মাকে সাহায্য করতে পারবেন না। এমন শর্ত বাতিল।

শরিয়ত ও আইন

হানাফি মাযহাবে বিয়েতে জুড়ে দেওয়া অনেক শর্ত চুক্তির বাধ্যতামূলক অংশ হয় না — বিয়ে শুদ্ধ থাকে, বিয়ের উদ্দেশ্যের বিপরীত শর্ত বাতিল হয়, আর সাধারণ অনেক শর্ত প্রতিশ্রুতি হিসেবে থাকে। হাম্বলি মাযহাবে বৈধ শর্ত পালন করা বাধ্যতামূলক। তাই অনেক পরিবার গুরুত্বপূর্ণ শর্তের সাথে ১৮ নং কলামে শর্তসাপেক্ষ তালাকের ক্ষমতা যুক্ত করেন।

দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আইন আলাদা: বর্তমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় সালিশি পরিষদের পূর্ব লিখিত অনুমতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করা যায় না, আর অনুমতি ছাড়া করলে বর্তমান স্ত্রীর পুরো মোহর (নগদ ও বাকি) সাথে সাথে পরিশোধ করতে হয় এবং সাজাও হতে পারে (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১, ধারা ৬)।

তালাকের ক্ষমতা অর্পণ — কলাম ১৮

১৮স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তালাকে তাফবীয)সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
কী জানতে চাওয়া হয়

স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করেছেন কি না; করে থাকলে কী কী শর্তে।

কী লিখবেন

দুই পক্ষের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তিনটির একটি: শর্তসাপেক্ষে “হ্যাঁ” (শর্তগুলো স্পষ্ট করে লিখে), শর্তহীনভাবে “হ্যাঁ”, অথবা “না”।

শর্তসাপেক্ষ ভাষার একটি নমুনা: “হ্যাঁ — স্বামী একটানা ৬ মাস স্ত্রীর খোঁজখবর না রাখলে, একটানা ৩ মাস ভরণপোষণ না দিলে, স্ত্রীর ওপর শারীরিক বা মানসিক নির্যাতন করলে, স্ত্রীর লিখিত সম্মতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করলে, অথবা ১৭ নং কলামের কোনো শর্ত ভঙ্গ করলে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করতে পারবেন।”

সাধারণ ভুল

ঘরটি না বুঝে কাজী সাহেবের ওপর ছেড়ে দেওয়া, বা মজলিসে হঠাৎ এ নিয়ে তর্ক — আগে থেকে দুই পরিবার আলোচনা করে নিন।

“১৭ নং কলামের শর্ত ভঙ্গ করলে” লিখে ১৭ নং কলামে কোনো শর্তই না রাখা।

শরিয়ত ও আইন

তালাকে তাফবীয মানে স্বামী তাঁর তালাকের ক্ষমতা স্ত্রীকে অর্পণ করা — স্ত্রী তখন নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করতে পারেন। এটি খোলা (স্ত্রীর অনুরোধে, সাধারণত মোহর ছেড়ে দেওয়ার বিনিময়ে বিচ্ছেদ) নয়, আর এতে স্বামীর নিজের তালাকের অধিকারও চলে যায় না। হানাফি ফিকহ ও বাংলাদেশের আইনে এই ক্ষমতা শর্তসাপেক্ষে বা শর্তহীন — দুইভাবেই দেওয়া যায়; অনেক আলেম ও পরিবার শর্তসাপেক্ষ অর্পণকে ভারসাম্যপূর্ণ মনে করেন।

আইনি পদ্ধতি: অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করলেও তালাকের নিয়ম মানতে হয় — ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা বা সিটি কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান/মেয়রকে লিখিত নোটিশ (অন্য পক্ষকে কপি), এবং নোটিশ পৌঁছানোর ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়, এর মধ্যে প্রত্যাহার না হলে। এ সময়ে আপসের জন্য সালিশি পরিষদ গঠিত হয় (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১, ধারা ৭ ও ৮)।

এই ঘরে “না” থাকলেও স্ত্রীর সব পথ বন্ধ হয় না — আইনে নির্দিষ্ট কারণে তিনি আদালতের মাধ্যমে বিবাহবিচ্ছেদ চাইতে পারেন (মুসলিম বিবাহবিচ্ছেদ আইন, ১৯৩৯)। তবে সে পথ দীর্ঘ; এ কারণেই অনেকে ১৮ নং কলাম যত্ন করে পূরণ করেন।

অন্যান্য তথ্য ও নিবন্ধন — কলাম ১৯ থেকে ২৫

১৯স্বামীর তালাকের অধিকার খর্ব হয়েছে কি না (বিলুপ্ত)
কী জানতে চাওয়া হয়

পুরোনো ফর্মে জানতে চাওয়া হতো স্বামীর তালাক দেওয়ার অধিকার কোনোভাবে খর্ব করা হয়েছে কি না। ২০২৫ সালের সংশোধনে (এস.আর.ও. নং ৯২-আইন/২০২৫) এই কলামটি বিলুপ্ত করা হয়েছে।

কী লিখবেন

নতুন ফর্মে এই ঘর নেই। পুরোনো ছাপা ফর্ম ব্যবহার হলে কী লিখবেন, কাজী সাহেবের কাছে জেনে নিন।

২০মোহর বা ভরণপোষণ নিয়ে আলাদা দলিল
কী জানতে চাওয়া হয়

বিয়ের সময় দেনমোহর, খোরপোশ (ভরণপোষণ) ইত্যাদি নিয়ে আলাদা কোনো দলিল করা হয়েছে কি না; হলে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ।

কী লিখবেন

আলাদা চুক্তিপত্র বা দলিল করা হলে তার সংক্ষিপ্ত বিবরণ ও তারিখ; না হলে “না”।

২১বরের বৈবাহিক অবস্থা
কী জানতে চাওয়া হয়

২০২৫ সালের সংশোধিত ফর্মের ভাষায়: বর বিবাহিত, অবিবাহিত, বিপত্নীক অথবা তালাকপ্রাপ্ত পুরুষ কি না?

কী লিখবেন

চারটির যেটি সত্য, সেটি।

সাধারণ ভুল

বর্তমান স্ত্রী থাকার কথা গোপন করা — এটি আইনে দণ্ডনীয় এবং কনের পরিবারের সাথে প্রতারণা।

২২দ্বিতীয় বিয়ের জন্য সালিশি পরিষদের অনুমতি
কী জানতে চাওয়া হয়

বর বিবাহিত হলে অন্য বিয়ের জন্য মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১ অনুযায়ী সালিশি পরিষদের অনুমতি নিয়েছেন কি না; নিয়ে থাকলে অনুমতিপত্রের নম্বর ও তারিখ।

কী লিখবেন

প্রথম বিয়ে হলে প্রযোজ্য নয়। দ্বিতীয় বিয়ে হলে অনুমতিপত্রের নম্বর ও তারিখ — অনুমতি ছাড়া এমন বিয়ে নিবন্ধন করা যায় না।

শরিয়ত ও আইন

আইন (ধারা ৬): বর্তমান স্ত্রী থাকা অবস্থায় আবেদনে কারণ ও বর্তমান স্ত্রীর সম্মতি আছে কি না জানাতে হয়; চেয়ারম্যান দুই পক্ষের প্রতিনিধি নিয়ে সালিশি পরিষদ গঠন করেন, যা বিয়েটি প্রয়োজনীয় ও ন্যায়সংগত মনে করলে অনুমতি দিতে পারে।

২৩যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন
কী জানতে চাওয়া হয়

যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন, তাঁর নাম ও পিতার নাম।

কী লিখবেন

কাজী সাহেব নিজে পড়ালে তাঁর নাম; অন্য কোনো আলেম বা ইমাম পড়ালে তাঁর নাম ও পিতার নাম।

২৪নিবন্ধনের তারিখ
কী জানতে চাওয়া হয়

বিয়ে রেজিস্ট্রি করার তারিখ।

কী লিখবেন

যেদিন কাজী সাহেব রেজিস্টারে বিয়েটি লিপিবদ্ধ করলেন।

২৫পরিশোধিত রেজিস্ট্রি ফি
কী জানতে চাওয়া হয়

বিয়ে নিবন্ধনের জন্য কত ফি পরিশোধ করা হয়েছে।

কী লিখবেন

যত টাকা দেওয়া হয়েছে, তত — আর ফি-এর রসিদ বুঝে নিন। সরকারি হারের হিসাব “কাবিন ফি” ট্যাবে।

শরিয়ত ও আইন

এর পরে বর, কনে, উকিল ও সাক্ষীদের স্বাক্ষর; ২০২৫ সালের সংশোধনে বর ও কনের স্বাক্ষরের সাথে টিপসইও যুক্ত হয়েছে। সব ঘর পূরণ না দেখে স্বাক্ষর করবেন না, আর নিবন্ধনের পর কাবিননামার সত্যায়িত কপি সংগ্রহ করে যত্নে রাখুন।

সাক্ষী, উকিল ও অভিভাবক (ওলি) — কে কী

সাক্ষী: হানাফি মাযহাবে বিয়ে শুদ্ধ হতে অন্তত দুজন সাক্ষী লাগে — দুজন মুসলিম পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী। তাঁদের প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হতে হবে, এবং একই মজলিসে প্রস্তাব ও কবুল নিজ কানে শুনে বুঝতে হবে যে এটি বিয়ে। হানাফি মতে সাক্ষীর ন্যায়পরায়ণ (আদিল) হওয়া বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়, যদিও তা উত্তম; শাফেয়ি মাযহাবে এটি শর্ত। সরকারি ফর্মে ২০২৫ সালের সংশোধনের পর বিয়ের সাক্ষীর তিনটি ঘর আছে (কলাম ১১)।

কনের উকিল: বাংলাদেশে কনে সাধারণত মজলিসে নিজে কবুল বলেন না; তিনি একজন উকিল — প্রায়ই বাবা, ভাই বা কোনো নিকটাত্মীয় — নিযুক্ত করেন, যিনি দুজন সাক্ষীর সামনে কনের সম্মতি নিয়ে মজলিসে তা পৌঁছে দেন (কলাম ৭–৮)। আসল বিষয় কনের স্বাধীন সম্মতি — রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, পূর্বে বিবাহিতা নারীর বিয়ে তাঁর মত ছাড়া এবং কুমারীর বিয়ে তাঁর অনুমতি ছাড়া দেওয়া যাবে না (সহীহ বুখারী ৫১৩৬)।

অভিভাবক (ওলি): ওলি হলেন কনের অভিভাবক — সাধারণত বাবা, না থাকলে দাদা, ভাই ইত্যাদি। এ বিষয়ে মাযহাবগুলোর মত ভিন্ন: অধিকাংশ আলেম (মালেকি, শাফেয়ি ও হাম্বলি) বলেন, ওলি ছাড়া বিয়ে শুদ্ধ হয় না — তাঁদের দলিল “ওলি ছাড়া বিয়ে নেই” (জামে তিরমিযী ১১০১, সুনান ইবনে মাজাহ ১৮৮১)। হানাফি মাযহাবে প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের নারীর নিজের সম্মতিতে করা বিয়ে শুদ্ধ, তবে অভিভাবকের মাধ্যমে বিয়ে হওয়াই উত্তম; আর পাত্র উপযুক্ত (কুফু) না হলে অভিভাবকের আপত্তির অধিকার আছে — পরবর্তী অনেক হানাফি ফকিহের মতে সে অবস্থায় অভিভাবকের সম্মতি ছাড়া বিয়ে শুদ্ধই হয় না। নিজের পরিস্থিতিতে একজন নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন; পরিবারের সম্মতি ও দোয়া নিয়ে বিয়েই সবচেয়ে কল্যাণকর।

সাধারণ জিজ্ঞাসা

কাবিননামার ১৮ নম্বর কলাম কী এবং এখানে কী লিখতে হয়?

১৮ নং কলামে জানতে চাওয়া হয়, স্বামী স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ (তালাকে তাফবীয) করেছেন কি না, আর করলে কোন কোন শর্তে। এতে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করার অধিকার পান; স্বামীর নিজের তালাকের অধিকার চলে যায় না, আর এটি খোলাও নয়। হানাফি ফিকহ ও বাংলাদেশের আইনে ক্ষমতাটি শর্তসাপেক্ষে বা শর্তহীন — দুইভাবেই দেওয়া যায়; অনেকে শর্তসাপেক্ষে লেখেন, যেমন: একটানা কয়েক মাস ভরণপোষণ না দিলে বা খোঁজখবর না রাখলে, নির্যাতন করলে, স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া আরেকটি বিয়ে করলে, অথবা ১৭ নং কলামের শর্ত ভঙ্গ করলে। দুই পক্ষ না চাইলে “না” লেখা হয়। ক্ষমতা প্রয়োগ করলেও চেয়ারম্যানকে লিখিত নোটিশ দিতে হয় এবং ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয় (মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১, ধারা ৭ ও ৮)।

১ লক্ষ বা ৫ লক্ষ টাকা মোহরানায় সরকারি কাবিন ফি কত?

২০২২ সালের সংশোধিত বিধি অনুযায়ী (এস.আর.ও. নং ৩৭৭-আইন/২০২২, গেজেট ২৯ ডিসেম্বর ২০২২) ৫ লক্ষ টাকা পর্যন্ত মোহরে প্রতি ১,০০০ টাকা বা তার অংশের জন্য ১৪ টাকা, আর ৫ লক্ষের বেশি হলে পরের প্রতি ১ লক্ষ টাকা বা তার অংশের জন্য ১০০ টাকা; সর্বনিম্ন ফি ২০০ টাকা। সে হিসাবে ১ লক্ষ টাকা মোহরে ফি ১,৪০০ টাকা, ৫ লক্ষে ৭,০০০ টাকা, আর ১০ লক্ষে ৭,৫০০ টাকা। ফি দেন বর। কাজী সাহেবকে বাড়িতে আনলে প্রতি কিলোমিটারে ১০ টাকা যাতায়াত খরচ এবং নকলের জন্য ৫০ টাকা আলাদা নির্ধারিত আছে। যা দেবেন, তার রসিদ চেয়ে নিন।

কাবিননামায় কী কী শর্ত যোগ করা জায়েজ?

যে শর্ত হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল করে না এবং বিয়ের উদ্দেশ্যের বিপরীত নয় — তা যোগ করা যায়। যেমন: ভরণপোষণ ও নির্দিষ্ট মাসিক হাতখরচ, স্ত্রীর পড়াশোনা বা শরিয়তসম্মত চাকরি চালিয়ে যাওয়া, যৌথ পরিবারে নিজস্ব ঘর বা আলাদা বাসা, বাবা-মায়ের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ, বাকি মোহর পরিশোধের সময়সূচি, নির্যাতন না করা এবং বিরোধে দুই পরিবারের মুরুব্বিদের মাধ্যমে মীমাংসা (সূরা আন-নিসা ৪:৩৫)। বাতিল শর্তের উদাহরণ: স্বামী বাবা-মাকে সাহায্য করতে পারবেন না, মোহর বা ভরণপোষণ থাকবে না, অথবা বর্তমান স্ত্রীকে তালাক দিতে হবে (সহীহ বুখারী ২১৪০, ৫১৫২)।

কাবিননামায় লেখা শর্ত কি বাধ্যতামূলক?

এ নিয়ে মাযহাবগুলোর মত ভিন্ন। হানাফি মাযহাবে — বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান যা অনুসরণ করেন — বিয়েতে জুড়ে দেওয়া অনেক শর্ত চুক্তির বাধ্যতামূলক অংশ হয় না: বিয়ে শুদ্ধ থাকে, বিয়ের উদ্দেশ্যের বিপরীত শর্ত বাতিল হয়, আর সাধারণ অনেক শর্ত প্রতিশ্রুতি হিসেবে থাকে, যা রক্ষা করা দ্বীনি দায়িত্ব। হাম্বলি মাযহাবে বৈধ শর্ত পালন করা বাধ্যতামূলক, আর ভাঙলে স্ত্রী বিচ্ছেদ চাইতে পারেন; তাঁদের দলিল রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর বাণী: যে শর্ত পূরণ করা সবচেয়ে জরুরি, তা সেই শর্ত যার মাধ্যমে তোমরা স্ত্রীকে হালাল করেছ (সহীহ বুখারী ২৭২১, ৫১৫১)। এ কারণেই অনেক পরিবার গুরুত্বপূর্ণ শর্তের সাথে ১৮ নং কলামে শর্তসাপেক্ষ তালাকের ক্ষমতা যুক্ত করেন। নিজের ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য আলেম বা আইনজীবীর পরামর্শ নিন।

উকিল ও সাক্ষী কারা হতে পারেন?

কাবিননামার “উকিল” হলেন কনের প্রতিনিধি — সাধারণত বাবা, ভাই বা কোনো নিকটাত্মীয় — যিনি দুজন সাক্ষীর সামনে কনের সম্মতি নিয়ে মজলিসে তা পৌঁছে দেন (কলাম ৭–৮)। হানাফি মাযহাবে বিয়ের সাক্ষী হতে পারেন দুজন মুসলিম পুরুষ, অথবা একজন পুরুষ ও দুজন নারী — প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কের, যাঁরা প্রস্তাব ও কবুল একসাথে শুনেছেন; হানাফি মতে সাক্ষী ন্যায়পরায়ণ (আদিল) হওয়া বিয়ে শুদ্ধ হওয়ার শর্ত নয়, তবে শাফেয়ি মাযহাবে তা শর্ত। ২০২৫ সালের সংশোধনের পর সরকারি ফর্মে বিয়ের সাক্ষীর তিনটি ঘর আছে (কলাম ১১)।

জরুরি কথা

এই পাতাটি একটি শিক্ষামূলক সহায়িকা, আইনি পরামর্শ নয়। ফিকহের মাসআলা হানাফি মাযহাব (বাংলাদেশে অধিকাংশ মুসলমান যে মাযহাব অনুসরণ করেন) অনুযায়ী সাজানো, আর যেখানে অন্য মাযহাবের মত ভিন্ন, সেখানে তা জানানো হয়েছে। নিজের নির্দিষ্ট পরিস্থিতির জন্য নিকাহ রেজিস্ট্রার (কাজী), একজন আইনজীবী বা নির্ভরযোগ্য আলেমের পরামর্শ নিন।

হাদিসের নম্বর আন্তর্জাতিক নম্বর অনুযায়ী (সহীহ বুখারী — ফাতহুল বারী); বাংলা সংস্করণে নম্বর ভিন্ন হতে পারে।

সুন্নাহসম্মত বিয়ের জন্য উপযুক্ত জীবনসঙ্গী খুঁজছেন?

পরিবারের মাধ্যমে, নিরাপদে ও সম্মানের সাথে পাত্র-পাত্রী খুঁজুন।

আরও ফ্রি টুলস ও গাইড

বিয়ের প্রস্তুতিতে কাজে লাগবে — সম্পূর্ণ বিনামূল্যে